ফ্রি-মিক্সিং নারী পুরুষের অবাধ মিশ্রণ ইসলামী শরীয়াহ কি বলে?

হাফেজ মাওলানা আয়াজ উদ্দীনঃ ফ্রি-মিক্সিং আজকে আমাদের সমাজের ভয়ানক সমস্যা। সমস্যাটিও আবার এমন, সবাই বুঝতে পারছে। কিন্তু কেউ আমলে নিচ্ছে না। এক অন্ধকারের দিকে আমরা যেন উপায়হীনভাবে এগিয়ে চলছি বাংলাদেশের মত একটা দেশে। যেখানে ৯০% মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা হওয়া সত্ত্বেও ইসলামটা স্রেফ কিছু আচার অনুষ্ঠান। যেখানে নারী পুরুষের মধ্যে একটা পর্দার বিধান আছে এবং এই বিষয়ে কুরআন – হাদিসে যে স্ট্রিক্ট কথাবার্তা রয়েছে সে শিক্ষা আমাদের সন্তানদের দেওয়া হয় না। দেওয়ার কথাও না যেখানে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কোন কেয়ার নেই! পরিবার, আত্মীয়- স্বজনদের মধ্যে ইসলামী চর্চার অভাব, কো- এডুকেশন, ছেলেমেয়েদের “বন্ধু আড্ডা গান” এর অবাধ স্বাধীনতা, জাফর ইকবাল গংদের সেক্যুলারিজমের নামে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি চর্চার মগজ ধোলাই, নোংরা সংস্কৃতি, সস্তা গল্প উপন্যাস, মুভি এসবের পর্দাহীন জীবনের আহবান। সবকিছু মিলিয়ে সহজেই অনুমেয় যে, আমরা/ আপনারাদের সন্তানেরা কিভাবে বড় হচ্ছে? কিভাবে আমরা আশা করব যে ছেলে মেয়েরা নারী পুরুষের মধ্যে পর্দা, নন মাহরামের সাথে নিরাপদ দুরুত্ব বজায় রেখে চলা এসবের প্রতি সচেতন হবে? এটা আমরা আশা করতে পারি না বলেই আমরা এটাও আশা করতে পারছি না যে সমাজ থেকে অশ্লীলতা, ফ্রি মিক্সিং এর মত বিষয়গুলো দূরীভূত হবে। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে, সবাই যখন স্রোতের টানে গা ভাসিয়ে দেয় তখন স্রোতের বিপরীতে কিছু মানুষ থাকে!

ইসলামে পর্দার কথা আসলেই আমরা চোখ বন্ধ করে মনে করি এক টুকরো কালো কাপড়। তার চেয়েও বড় কথা পর্দা প্রসঙ্গ আসলেই মেয়েদের কথা ছাড়া ছেলেদের প্রসঙ্গ উঠেই না, ব্যাপারটা এমন যেন ছেলেদের জন্য পর্দার কোন বিধান নেই। কিন্তু আমরা যদি কুরআন খুলে দেখি তাহলে দেখবো, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রথমেই বলেছেন ছেলেদের পর্দার কথা।

এবার আমরা চিন্তা করি নবী পত্নীদের জন্য আল্লাহর আদেশ যদি এরকম হয় তাহলে আমাদের অবস্থা কি হবে!! এসব হচ্ছে কুরআনের কথা, মহান আল্লাহর কথা। এখানে কোন “না মানে ইয়ে” কিংবা মন খুঁতখুঁত করার কিছুই নেই। কোন যুক্তি নেই নারী পুরুষের সম্পর্ককে সহজ মনে করার। “মুমিন মুমেনা একে অপরের সহযোগী” আয়াত দেখে যারা এইসব সুস্পষ্ট আয়াতগুলোকে হালকা ভেবে পর্দা ভেঙ্গে যাচ্ছেন, অপ্রয়োজনীয় কথা বলা কিংবা লুতুপুতু করে যাচ্ছেন তাদের বলব সেই আয়াতের তাফসীর খুলে দেখুন “সহযোগী” মানে কি বুঝানো হয়েছে। সেখানে কোনভাবেই আপনাকে টেম্পু চালানোর লাইসেন্স দেওয়া হয়নি! কোনভাবেই আপনাকে শয়তানের জন্য ফিতনার দরজা খুলে রাখার কথা বলা হয়নি। আমাদের ভাবটা এমন যেন শয়তানের সাথে আমরা চুক্তি করে রেখেছি যে শয়তান আমাদের পিছু নেবে না! দীনী বোনেরা ফেসবুকে ছবি আপলোড দেবে আর দীনী ভাইয়েরা সেখানে মাশাআল্লাহ, সুবাহানাল্লাহ কমেন্ট করে সওয়াব হাসিল করবে (!!)! দীনী ভাইয়েরা ভাবুক ভাবুক স্ট্যাটাস হাঁকাবে আর দীনী বোনেরা সেখানে ভেংচি, চোখ মারা ইমুশনের জোয়ার বইয়ে দীনী ফাজলামো করবে!! কি জায়েজ?? ফেসবুকে উঁচু লেভেলের দীনী স্ট্যাটাস থাকা ভাইয়েরাও তলে তলে ফেসবুক ইনবক্সে টেম্পু চালায় আর হিজাব, নিকাব এমনকি তীব্র গরমে হাত মোজা পরার প্রশংসনীয় মুমেন নারীরাও টেম্পু চালিয়ে দীনী ভাইদের মনে ঝড় তুলেছে এমনও আছে!

যখন দ্বীনের পথে পথচলা আপনাকে শিখিয়ে দেবে এসব মেয়ে প্রীতি, টেম্পু চালানো, ফ্রি মিক্সিং, নন মাহরামকে তোড়াই কেয়ার করে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা এসব কত তুচ্ছ। এসব দ্বীনের পথে কাজ করাকে ব্যাহত করে, নিয়্যতের পরিশুদ্ধতা নষ্ট করে, শয়তানকে মনের ভেতর অবাধ বিচরণের সুযোগ করে দেয়।

ইসলামের সবগুলো ইস্যুর মত এই ইস্যুটাও উপলব্ধির। দ্বীনের জন্য এগুলো ক্ষতিকর এবং শয়তানের জন্য ফিতনার দুয়ার খুলে দেওয়ার মত। এটা বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ হয়ত সবাইকে দেন না। এগুলো ফিতনা মনে করার মত অন্তরের বুঝ হয়ত সবার ভেতর থাকেনা! আল্লাহর হেদায়াত কারো কাছে বলে কয়ে আসেনা। একান্ত চেষ্টা, মহান রবের কাছে আকুতি আর শুদ্ধ নিয়্যতের মাধ্যমেই আমরা মহান আল্লাহর কাছে হেদায়াত আশা করতে পারি।

এই ফ্রি-মিক্সিং এমন এক সমস্যা, যা হাজারও সমস্যার কারণ। বড়-বড় সামাজিক অপরাধ ও রাষ্ট্রীয় অস্থিরতার একদম প্রধান ও মৌলিক সমস্যা যদি আমরা বের করতে চাই তাহলে দেখা যাবে, ৯৮% সমস্যার মূলে আছে এই অপরাধটি।
পরিশেষে বলতে চাই নন মাহরাম, ফ্রি মিক্সিং, এবং দ্বীনের খাতিরেও কতটুকু মেশা যাবে সে বিষয়ে সীমাটা জানা জরুরী। সবকিছুর একটা সীমা আছে। সীমার বাইরে গেলে শয়তানের খপ্পরে তো পড়তেই হবে সব ধ্বংস ও হবে। যেখানে কথা বলার কোন দরকারই নেই, যেখানে খামোখা শয়তানকে সুযোগ দেওয়াটা অর্থহীন একটা কাজ। সেখান থেকে নিজেকে বিরত রাখাই উত্তম।

কিন্তু আমরা কী এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখছি!? এমন একটি মৌলিক ও প্রধান সমস্যাকে গুরুত্বহীনভাবে রেখে বরং এর বিস্তার যেন আরও আরও ছড়িয়ে পড়ে। এসব আয়োজনের পথ বন্ধ না করে কোনোভাবে কি সমাজের এত এত অন্যায় বন্ধ করা সম্ভব?।
যদি আমরা ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতাম তাহলে ঢাকা কলাবাগানের আলোচিত আনুশকা-দিহানের ইস্যু তৈরী হত না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে অনুধাবনের তৌফিক দিন। আল্লাহ সবাইকে হেদায়াত দিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দ্বীনের সাথে আমাদের অন্তরকে বেঁধে নেওয়ার শক্তি ও ঈমান দান করুন, আমীন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, তরুন আলেম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *