যাকাত একটি ফরজ এবাদাত

যাকাত একটি ফরজ এবাদাত

-মুহাম্মাদ মাজহারুল ইসলাম
যাকাত একটি ফরজ এবাদাত, যা বুঝে শুনে ক্ষেত্র বিশেষে আদায় করা বাঞ্ছনীয়, অন্ধের মত চোখ বুজে দিয়ে দিলেই আদায় হবে না। বৈবাহিক সম্পর্ক ও ঔরষজাত সম্পর্কের মানুষকে যাকাত দেয়া যায় না। কাজেই স্বামী-স্ত্রী, পিতা-পুত্র, দাদা-নাতী কাউকে যাকাত দেয়া যাবে না। অনুরূপভাবে রাসূল স. এর বংশের কাউকে যাকাত দেয়া যাবে না।

এছাড়া যে কোনো গরীবকে যাকাত দেয়া যাবে। গরীব বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝায়, যার হয়ত কোনো সম্পদই নেই। কিংবা আছে, তবে তার প্রয়োজনীয় সম্পদ ও জীবন যাপনে প্রয়োজনীয় খরচ বাদ দিলে তা নেসাবের চেয়ে কম হয়। সমাজে কোনো না কোনো কারণে কিছু লোকের অভাব থেকে যায়। আল্লাহ এ জাতীয় লোকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য যাকাত ফরয করেছেন। সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে যাকাতের ৮ টি খাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছেঃ অন্য কোনো কাজে যাকাতের টাকা খরচ করা যাবে না।

১. ফকীর- যারা এত গরীব, অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয় তাদের জন্য। ২. মিসকীন- যারা অভাবী হলেও লজ্জায় কারো কাছে চায় না, তাদের সাহায্যের জন্য। ৩. সরকারের যাকাত বিভাগের কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্য। ৪. নতুন মুসলমান- যাদের মন জয় করা দরকার। নওমুসলিমদেরকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যও যাকাত দেওয়া যাবে। ৫. দাসদের মুক্তির জন্য, বা জরিমানা আদায় না করতে পারায় যারা জেলে পড়ে আছে তাদের মুক্তির জন্য। ৬. ঋণগ্রস্থদেরকে- ঋণের বোঝা থেকে উদ্ধার করার জন্য। ৭. আল্লাহ দীনকে বিজয়ী করার আন্দোলনে সাহায্য করার জন্য। ৮. মুসাফির অবস্থায় অভাবে পড়ে গেলে তার অভাব দূর করার জন্য। নিজের বাড়িতে কেউ ধনী হলেও মুসাফির অবস্থায় অসহায় হতে পারে।

যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনকে প্রাধান্য দেয়া উচিৎ। যাকাত আদায়ের সময় ‘যাকাতের টাকা’ উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। আদায়ের সময় বা যাকাতের টাকা আলাদা করার সময় নিয়্যত করলেই হবে। তবে এই দুই সময়ের কোনোটাতেই নিয়্যত না করলে যাকাত আদায় হবে না। এমনিতে কাউকে টাকা দিয়ে পরে তা যাকাতের খাত থেকে দিয়েছে নিয়্যত করলে যাকাত আদায় হবে না।

এখানে উল্লেখ্য যে, যাকাতের ক্ষেত্রে গরীবকে মালিক বানিয়ে দেয়া শর্ত। কাজেই যাকাতের টাকা দিয়ে মসজিদ বানানো, মাদ্রাসা বানানো, রাস্তাঘাট নির্মাণ, কূপ খনন ইত্যাদি করা যাবে না। বরং সরাসরি গরীবকে যাকাতের টাকার মালিক বানিয়ে দিতে হবে। কোনো গরীবকে পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিবাহ দেয়ার জন্যও যাকাত দেয়া যেতে পারে। তবে তাকে সে টাকার মালিক বানিয়ে দিতে হবে। যাকাতের টাকা নগদ না দিয়ে গঠনমূলক কিছু ক্রয় করে দেয়া যেতে পারে। যেমন, কেউ কাজ করার সামর্থ্যবান হলে তাকে সেলাই মেশিন, রিক্সা, ভ্যান, কম্পিউটার ইত্যাদি ক্রয় করে দেয়া যেতে পারে। যেন তা দিয়ে উপার্জন করে সে স্বাবলম্বী হতে পারে। এবং এক সময় তাকে আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়। অল্প অল্প করে অনেককে না দিয়ে প্রতিবছর পরিকল্পনা করে কিছু মানুষকে বেশি করে দিলে সে তাকে গঠনমূলক কাজে লাগাতে পারবে। যাকাত ফরয হওয়ার পর যাকাত আদায় না করা হলে পরবর্তীতে পূর্বের অনাদায়কৃত সব বছরের যাকাত আদায় করে দিতে হবে। হারাম সম্পদে যাকাত আসে না এবং হারাম সম্পদ দিয়ে যাকাত আদায়ও করা যায় না। যাকাত তো হল সম্পদের কেবল ২.৫ শতাংশ। আর হারাম সম্পদ তো পুরো একশ শতাংশই দান করে দেয়া ওয়াজীব। কারণ এ সম্পদের মালিক ব্যক্তি নয়। কাজেই সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে দখলকৃত সম্পত্তি ইত্যাদি সব প্রকার হারাম সম্পদ তাৎক্ষণিক ভাবে সওয়াবের নিয়্যত ছাড়া দান করে দায়মুক্ত হতে হবে।

সব ধরণের অভাবী লোকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মহান উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তাআলা যাকাত ফরয করেছেন এবং এটাকে বড় ইবাদত হিসেবে গণ্য করেন। ইসলামে ভিক্ষা করা অত্যন্ত মন্দ। এ থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য যাকাত জরুরি। যারা গরীব অথচ হাত পাতে না, তাদেরকে খুঁজে বের করা সরকারের বিরাট দায়িত্ব। ধনীদের থেকে যাকাত উসুল করা ও হকদারদেরকে পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য যারা কাজ করবে, তাদের বেতন যাকাত থেকেই দিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *