আহলান সাহলান হে মাহে রমজান

আহলান সাহলান মাহে রমজান

মুহাম্মাদ মাজহারুল ইসলাম: পবিত্র রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের ছায়া বিস্তার করেছে। আর কয়েকটা দিন পরেই জান্নাত লাভের এই পবিত্র সমুহান মাস পেয়ে ধন্য হবে সমগ্র মুসলিম জাহান। সাধনার মাধ্যমে পৌঁছে যাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টির রাইয়ান নামক দরজায়। সেই জন্য এখনই রমজান কারীমকে জানাই স্বাগতম।

মুত্তাকি হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে প্রতিবছরই সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজান আসে আমাদের মাঝে । সিয়ামের শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা। ফার্সী ভাষায় এটাকে রোযা বলা হয়। রোযা একটি ফরজ ইবাদাত। রোযা দ্বিতীয় হিজরীতে ফরজ করা হয়েছে। রোযা ফরজ হওয়ার ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)। রমজান মাসের পরিচয়ে আল্লাহ বলেন, রমজান হলো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছিল। মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও সুস্পষ্ট পথ নির্দেশক এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়কারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যারাই এ মাস পাবে তারা যেন অবশ্যই সিয়াম পালন করে। (বাকারাহ : ১৮৫)।

রাসূলুল্লহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি :
(১) এ মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর সত্যিকার কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল,
(২) সলাত কায়েম করা,
(৩) যাকাত দেয়া,
(৪) রমজান মাসের সিয়াম পালন করা এবং
(৫) সক্ষম ব্যক্তির হাজ্জ আদায় করা
(বুখারী ও মুসলিম)।

পবিত্র রমজান মাসের ফযীলতঃ
রমজান চন্দ্র মাসের একটি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের ফযীলত অপরিসীম। নীচে রমজান মাসের কিছু ফযীলত তুলে ধরা হল:

১. রমজান হল কুরআন নাযিলের মাস। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “রমাযান মাস— যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে” (আল-বাকারা : ১৮৫)। সিয়াম যেমন এ মাসে, কুরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসেই। ইতিপূর্বেকার তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীলসহ যাবতীয় সকল আসমানী কিতাব এ মাহে রমযানেই নাযিল হয়েছিল (সহীহ আল জামে)। এ মাসেই জিবরীল আলাইহিস সালাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন শুনাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে তিলাওয়াত শুনতেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ রমযানে পূর্ণ কুরআন দু’বার খতম করেছেন (মুসলিম)।

২. এ মাসের সিয়াম পালন জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সলাত কায়েম করল, যাকাত আদায় করল, রমজান মাসে সিয়াম পালন করল তার জন্য আল্লাহর ওপর সে বান্দার অধিকার হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া (বুখারী)।

৩. ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন হল সিয়াম। আর এ সিয়াম পালন করা হয় এ মাসেই। আল্লাহ তা’আলা বলেন : হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার (বাকারাহ : ১৮৩)।

৪. রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। হাদীসে এসেছে “যখন রমজান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় আর জাহা্ন্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়” (মুসলিম)। আর এজন্যই এ মাসে মানুষ ধর্ম-কর্ম ও নেক আমলের দিকে অধিক তত্পর হয় এবং মসজিদের মুসল্লীদের ভীড় অধিকতর হয়।

৫. এ রমজান মাসের লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদত অপরাপর এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি। অর্থাত্ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সাওয়াব হয় এ মাসের ঐ এক রজনীর ইবাদতে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “কদরের একরাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতা আর রূহ (জিরীল আঃ) তাদের রব্ব-এর অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়। (এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি— তা ফযর উদয় হওয়া পর্যন্ত থাকে” (সূরা ক্বদর : ৪-৫)। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে মূলতঃ সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল।”

৬. এ পুরো মাস জুড়ে দু’আ কবূল হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ রমজান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সমীপে যে দু’আই করে থাকে—তা মঞ্জুর হয়ে যায়।”

৭. এ মাসে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মাহে রমাযানে প্রতিরাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ তা’আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা দিয়ে থাকেন এবং প্রতিটি রাত ও দিনের বেলায় প্রত্যেক মুসলিমের দু’আ— মুনাজাত কবূল করা হয়ে থাকে।

পবিত্র রমজানের ফজিলতঃ
পবিত্র রমজানুল মুবারক আমাদের মাঝে সমাগত। রসূল (স.) রোজা শুরু হওয়ার আগে তার সাহাবীদেরকে কিভাবে সচেতন করতেন নিম্নের হাদীস হতে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি। হযরত সালমান ফারসী (রা.) প্রমুখ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, শা’বান মাসের শেষ দিন রসুলুল্লাহ (স.) আমাদিগকে খুত্বা শুনালেন, যাতে তিনি বললেন—’হে জনগণ! তোমাদের উপর একটি মহান ও পবিত্র মাস আসছে, যার মধ্যে এমন একটি রাত্র রয়েছে যা হাজার রাত্র হতেও উত্তম।”যে মাসের দিনগুলোতে আল্লাহ রোজাকে ফরয করেছেন এবং রাত্রিতে নামাযকে (তারাবীহকে) নফল করেছেন।’ ‘যে ব্যক্তি ঐ মাসে কোন একটি সদভ্যাস (বা সত্কাজ) করে তা ছওয়াবের দিক দিয়ে অন্য মাসের একটি ফরয কার্যের সমতুল্য হয়ে থাকে।’ আর একটি ফরয আদায় করলে, তা অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায়ের সমতুল্য ছওয়াবের হয়ে থাকে। ‘এটা হল ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্য অবলম্বনের পরিণাম হচ্ছে বেহেসতে। এটা পরোপকার ও সহানুভূতির মাস এবং এটা এমন একটি মাস যাতে ঈমানদারগণের রুযী বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে।’ ‘এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করায়, ইহার বিনিময়ে তার সমস্ত গুণাহ মাফ হয়ে যায় এবং সে জাহান্নাম হতে মুক্ত হয়।’ ‘তাছাড়া সে উক্ত রোজাদার ব্যক্তির তুল্য ছওয়ারও পাবে। এতে অবশ্য উক্ত রোজাদারের ছওয়াবে একটুও কমতি করা হবে না।’ আমরা বললাম ইয়া রসুলাল্লাহ (স.) আমাদের এমন কিছু সংস্থান নাই যা দ্বারা আমরা রোজাদারকে ইফতার করাতে পারি। তদুত্তরে হুযুর (স.) বললেন, ‘এই ছওয়াব আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তিকেও প্রদান করবেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে এক ঢোক দুধ বা একটি খোরমা কিংবা সুমিষ্ট পানি দ্বারা ইফতার করাবে।’ ‘আর যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে আমার ‘হাউয কাওছার’ হতে এমনভাবে পর্যাপ্ত করে পান করাবেন যে, বেহেশতে না যাওয়া অবধি তার আর পিপাসা লাগবে না। আর ঐ মাসের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক ক্ষমার ও তৃতীয় দশক জাহান্নাম হতে মুক্তির জন্য নির্ধারিত।’ ‘যে ব্যক্তি ঐ মাসে স্বীয় চাকরের উপর কার্যভার লাঘব করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম হতে আযাদ করে দেন।’ প্রিয় রসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘রামাযান মাসের প্রথম রাত্রি সমাগত হতেই শয়তান ও দুষ্টমতি জ্বিনগুলো শৃঙ্খলিত হয় এবং জাহান্নামের দ্বারগুলো রুদ্ধ করে দেয়া হয়, একটি দরোজাও মুক্ত থাকে না। আর বেহেশতের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়, ইহার একটাও বন্ধ থাকে না।’ আর কোন একজন গায়েবী আহ্বানকারী উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকেন যে, ‘হে পুণ্যার্থীগণ— অগ্রসর হও! হে পাপাত্মার দল—পিছিয়ে যাও! এইসময় আল্লাহর পক্ষ হতে বহু দোযখী মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এমনি করে প্রত্যেক রাত্রিতেই আহ্বান করা হয়।’ রসূলুল্লাহ (স.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রোজা রাখে, তার অতীত গোণাহ মাফ হয়ে যায়।’ ‘আর যে ব্যক্তি এই মাসে ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রাত জেগে (তারাবীহ) নামায পড়ে, তার অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ ‘যে ব্যক্তি শবে ক্বদর রাতে ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রাত জাগরণ করে নামায পড়ে, তারও অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন, ‘মানুষের প্রত্যেক সত্কর্মের ছওয়াব দশ হতে সাতশত গুণ বৃদ্ধি হয়ে থাকে।’ তবে আল্লাহ বলেন, ‘কেবল রোজা ব্যতীত। কেননা ইহা একমাত্র আমার জন্য সুতরাং ইহার পুরস্কার আমিই স্বহস্তে প্রদান করব। যেহেতু রোজাদার স্বীয় কামপ্রবৃত্তিকে দমন ও আহারাদি পরিহার করে থাকে কেবলমাত্র আমারই জন্য।’ হুযুর (স.) বলেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুইটি আনন্দ। একটি ইফ্তার কালে এবং অপরটি আল্লাহর সাথে দীদারকালে।’ তিনি আরো বলেন, ‘রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশ্ক হতেও অধিক সুগন্ধময়। তিনি বলেন, (রোজাদারগণের পক্ষে) রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।’ ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউই রোজা অবস্থায় নির্লজ্জ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ রোজাদারকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করতে আসে, তবে সে যেন বলে দেয় যে, আমি রোজাদার।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রোজা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ হতে বিরত রইল না, তার উপবাসে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।’ তিনি সাবধান করে বলেন যে, ‘বহু রোজাদার এমনও রয়েছে যে, ক্ষুধায়-পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ব্যতীত তাদের রোজা রাখায় আর কোন ফল নেই। এমনিভাবে বহু রাতজাগা নামাযী রয়েছে, যাদের রাত জাগরণ ব্যতীত অন্য কোন লাভ হয় না।’ হযরত নবীয়ে করীম (স.) বলেছেন যে, ‘আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলেন, যে রোজাদারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকল না, তার শুধু পানাহার হতে বিরত থাকায় কোন লাভ নেই।’ (হে শ্রোতাগণ! আল্লাহ বলেন) ‘তোমরা তোমাদের রবের দেয়া ক্ষমার দিকে দ্রুত অগ্রসর হও। আর ঐ বেহেশতের দিকে যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনব্যাপী! যা তিনি কেবল মুত্তাকীন বা পরহেজগারদের জন্যই প্রস্তুত করে রেখেছেন।

রোযার ফযীলতঃ
সিয়াম পালনের ফযিলত অগণিত। সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ নিজে যথার্থ পুরস্কার দেবেন। সিয়াম পালনকারীকে যেসব পুরস্কার ও প্রতিদান আল্লাহতায়ালা দেবেন তার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হলো :

১. আল্লাহ স্বয়ং নিজে সিয়ামের প্রতিদান দেবেন। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, “মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” বুখারী)

২. সিয়াম অতি উত্তম নেক আমল। আবু হুরাইরাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র একটি হাদীসে তিনি বলেছিলেন, ‘‘হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে একটি অতি উত্তম নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা, এর সমমর্যাদা সম্পন্ন কোন আমল নেই।’’ (নাসাঈ)

অন্যান্য ইবাদত মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু সিয়ামের মধ্যে তা নেই। লোক দেখানোর কোন আলামত সিয়াম পালনে থাকে না। শুধুই আল্লাহকে খুশী করার জন্য তা করা হয়। তাই এ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ ইখলাস। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘‘সিয়াম পালনকারী শুধুমাত্র আমাকে খুশী করার জন্যই পানাহার ও যৌন উপভোগ পরিহার করে।’’

৩. জান্নাত লাভ সহজ হয়ে যাবে। সহীহ ইবনু হিববান কিতাবে আছে আবু উমামা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু উমামা রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার কারণে আমি জান্নাতে যেতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদাসম্পন্ন কোন ইবাদাত নেই। (নাসাঈ)

৪. সিয়াম পালনকারীকে বিনা হিসেবে প্রতিদান দেয়া হয়। অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদান আল্লাহতায়ালা তার দয়ার বদৌলতে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু সিয়ামের প্রতিদান ও তার সাওয়াব এর চেয়েও বেহিসেবী সংখ্যা দিয়ে গুণ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, ‘‘মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’’ (মুসলিম)

৫. জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিয়াম ঢাল স্বরূপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পার।’’ (আহমাদ)

৬. জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সিয়াম একটি মজবুত দুর্গ। হাদীসে আছে, ‘‘সিয়াম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক মজবুত দুর্গ।’’

৭. ইফতারের সময় বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। হাদীসে আছে, ইফতারের মুহূর্তে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে। (আহমাদ)

৮. সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের চেয়েও উত্তম (সুগন্ধিতে পরিণত হয়)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জীবন সে সত্তার শপথ করে বলছি, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহতায়ালার কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)

৯. সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে : একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হলো তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারী ও মুসলিম)

১০. সিয়াম কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে। হাদীসে আছে, সিয়াম ও কুরআন কেয়ামতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। অনুরূপভাবে কুরআন বলবে, হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে। (আহমাদ)

১১. সিয়াম হল গুনাহের কাফফারা। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই নেক আমল পাপরাশি দূর করে দেয়। (সূরা হুদ : ১১৪) । নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ ও প্রতিবেশীদের নিয়ে জীবন চলার পথে যেসব গোনাহ মানুষের হয়ে যায় সালাত, সিয়াম ও দান খয়রাত সেসব গোনাহ মুছে ফেলে দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)

১২. সিয়াম পালনকারীর এক রমযান থেকে পরবর্তী রমযানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া ছগীরা গোনাহগুলোকে মাফ করে দেয়া হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, “তোমরা যদি নিষিদ্ধ কবীরা গোনাহ থেকে বিরত থাক তাহলে তোমাদের ছগীরা গোনাহগুলোকে মুছে দেব এবং (জান্নাতে) তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।” (সূরা নিসা : ৩১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এর মধ্যবর্তী সময় ও এক জুমা থেকে অপর জুমা এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়া ছগীরা গোনাহগুলোকে (উল্লেখিত ইবাদতের) কাফ্ফারাস্বরূপ মুছে দেয়া হয় সে যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসলিম)

১৩. সিয়াম পালনকারীর পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

১৪. সিয়াম যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ এটা তার জন্য নিবৃতকারী। (অর্থাৎ সিয়াম পালন যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত করে রাখে) (বুখারী ও মুসলিম)

১৫. সিয়াম পালনকারীরা রাইয়ান নামক মহিমান্বিত এক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কেয়ামতের দিন শুধু সিয়াম পালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।(বুখারী ও মুসলিম)

তাই আসুন, আমরা রোজা পালনের মাধ্যমে আমাদের গুনাহসমুহ মুছে ফেলি এবং মহান আল্লাহতালার সন্তুস্টি অর্জন করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *