প্রতিবেশীর হক

প্রতিবেশীর হক
-মুহাম্মাদ মাজহারুল ইসলাম

প্রতিবেশীদের প্রতি সদয় হওয়া ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ (সা:) প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক, ভালো ব্যবহার, ভালো আচার-আচরণ ও ভালোবাসা রাখার ব্যাপারে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতিবেশী তিন প্রকার।
১. মুসলিম প্রতিবেশী।
২. অমুসলিম প্রতিবেশী।
৩. মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী।
মা-বাবা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের পরই প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশীর দাবি বেশি।
এক প্রতিবেশীর ওপর অন্য প্রতিবেশীর বিভিন্ন অধিকার বা দাবি রয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সা:) প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে যত্নবান হওয়ার জন্য তাকিদ দিয়েছেন। 
এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতিবেশী যার অনিষ্ট হতে নিরাপদ নয়, সে জান্নাতে যাবে না’ (মুসলিম শরিফ)। 
হজরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘জিবরাঈল (আ:) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিতে লাগলেন যে, আমি ভাবলাম যে শিগগিরই তাকে (প্রতিবেশীকে) ওয়ারিস বা উত্তরাধিকারী বানাবেন’ (বুখারি ও মুসলিম)। 
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, একদা এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি ভালো কী মন্দ তা কিভাবে বুঝব? নবীজী (সা:) উত্তরে বললেন, ‘যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে অমুক লোকটি ভালো। তখন তুমি ভালো। আর যখন তুমি তোমার প্রতিবেশীকে বলতে শুনবে যে অমুক লোকটি ভালো নয়, তখন তুমি সত্যিই ভালো নয়’ (ইবনে মাজাহ)। 
হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি তার বন্ধুর সাথে ব্যবহারে উত্তম, আল্লাহর কাছে সে বন্ধুদের মধ্যে উত্তম এবং প্রতিবেশীর প্রতি যে উত্তম, আল্লাহর কাছে সে প্রতিবেশীদের মধ্যে উত্তম’ (তিরমিজি)।
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, একদা এক মজলিসে সাহাবায়ে কেরামগণের এক জামাত উপস্থিত ছিল। তখন রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ এবং কে নিকৃষ্ট আমি কি তা বলব? সবাই চুপ রইলেন। রাসূল তিনবার জিজ্ঞেস করলেন। মজলিস থেকে এক সাহাবি বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাদের তাদের সম্পর্কে বলুন। তখন রাসূল (সা:) বললেন, যে ব্যক্তির উপকারের আশা করা যায় এবং যে ব্যক্তির অনিষ্ট হতে নিরাপদ থাকা যায়, সে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং যার দ্বারা উপকারের আশা করা যায় না এবং অপকার হতেও নিরাপদ হওয়া যায় না, সে তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্ট অধম’ (বুখারি ও মুসলিম)। 
রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, ‘প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে যে পেট পুরে খায়, সে প্রকৃত মুসলমান নয়’ (মিশকাত)। 
রাসূলুল্লাহ (সা:) আরো ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর শপথ, ওই ব্যক্তির ঈমান নেই! আল্লাহর শপথ ওই ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার নয়। আল্লাহর কসম ওই ব্যক্তি ঈমান রাখে! জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কে সেই ব্যক্তি? রাসূল (সা:) বললেন, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না’ (বুখারি ও মুসলিম)।
হজরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত,
রাসূল (সা:) ইরশাদ করেছেন, যে আমার কাছ থেকে এ উপদেশগুলো গ্রহণ করবে এবং তদনুযায়ী আমল করবে, তাকে আমি শিা দেবো? বর্ণনাকারী বললেন আমি। তিনি আমার হাত ধরে পাঁচটি বিষয় গণনা করে বললেন,
১. হারামকে ভয় করবে, তবে তুমি লোকের মধ্যে বড় আবেদ হবে।
২. আল্লাহ যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকবে, তা হলে তুমি লোকের মধ্যে অভাবশূন্য হবে।
৩. তোমার প্রতিবেশীর উপকার করবে তা হলে তুমি প্রকৃত বিশ্বাসী হবে।
৪. তোমার জন্য যা ভালোবাস অন্যের জন্যও তা ভালোবাসবে, তাহলে প্রকৃত মুসলমান হবে এবং
৫. বেশি হাসাহাসি করো না, কেননা অধিক হাস্য হৃদয়কে মৃত করে’ (বুখারি, মুসলিম ও তিরমিজি)।

রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন, প্রতিবেশীর কী কী হক রয়েছে তা সম্পর্কে তোমরা অবগত আছ কি? তখন তিনি প্রতিবেশীর প্রতি ১০টি হকের কথা বর্ণনা করেন। হকগুলো হলোঃ
১. প্রতিবেশী তোমার সাহায্য চাইলে তাকে তুমি সাহায্য করবে।
২. সে তোমার অভয় চাইলে তুমি তাকে অভয় দেবে। ৩. সে কর্জে হাসানা চাইলে তুমি তাকে কর্জ দান করবে।
৪. সে নিঃস্ব হলে তাকে দান করবে।
৫. সে পীড়িত হলে তারে সেবা শুশ্রƒষা করবে।
৬. তার মৃত্যু হলে জানাজায় শরিক হবে।
৭. তার সুসংবাদ লাভে তুমি খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করবে।
৮. তোমার গৃহ তার অনুমতি ছাড়া এত বেশি উঁচু করবে না। যাতে বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়ে তার অসুবিধার কারণ হয়।
৯. তার বিপদাপদে সহানুভূতি প্রকাশ করবে এবং ১০. তুমি কোনো ফলফলাদি খরিদ করলে এবং ভালো খাবারের আয়োজন করলে প্রতিবেশীকেও কিছু অংশ দান করবে। যদি দেয়ার মতো না হয় তবে তা গোপনে গৃহে নিয়ে আসবে এবং সন্তানেরা যেন তার সন্তানদের বিরক্তি উৎপাদনের জন্য বাইরে না আসে’ (মিশকাত)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *