ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে কিলোমিটারপ্রতি ২০.১৮ টাকা টোল আদায়ের প্রস্তাব

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। এই পথ পাড়ি দিতে ১ হাজার ১১০ টাকা ভিত্তি টোল প্রস্তাব করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এ হিসাবে প্রতি কিলোমিটারের টোল হবে ২০ টাকা ১৮ পয়সা।

গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কেই পড়েছে পদ্মা সেতু। ফলে মহাসড়কের পাশাপাশি পদ্মা সেতুর জন্য দিতে হবে আলাদা টোল, যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী পদ্মা সেতুতে মাঝারি ট্রাকের টোল হতে পারে ২ হাজার ১০০ টাকা। প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হলে পদ্মা সেতুসহ ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ভিত্তি টোল দাঁড়াবে ৩ হাজার ২১০ টাকা।

২০১৪ সালের টোল নীতিমালায় মাঝারি ট্রাকের টোলকে ভিত্তি টোল হিসেবে ধরা হয়। এর ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় আরো ১২ ধরনের যানবাহনের টোল। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের প্রস্তাবিত টোলহারও নির্ধারণ করা হয়েছে এ নীতিমালার আলোকেই। নীতিমালা অনুযায়ী এক্সপ্রেসওয়েটি পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের কাতারে। এ ধরনের মহাসড়কের প্রতি কিলোমিটারের ভিত্তি টোল ২ টাকা। যদিও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রে ভিত্তি টোল প্রস্তাব করা হয়েছে ২০ টাকার বেশি।

বিষয়টির ব্যাখ্যায় সওজ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বলেছেন, ভিত্তি টোল বেশি হয়েছে মূলত তিনটি সেতুর টোল যুক্ত হওয়ার কারণে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা, মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী সেতু ১ ও ২ এবং মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ সেতুর টোল মোট ১ হাজার টাকা। সেতু তিনটির টোল বাদ দিলে ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ের টোল হবে ১১০ টাকা।

২০১৪ সালের টোল নীতিমালা অনুযায়ীই ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের টোলহার প্রস্তাব করার কথা জানিয়েছেন সওজ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা জোন) সবুজ উদ্দিন খান। তিনি জানান, প্রস্তাবে এক্সপ্রেসওয়ের সাতটি ফ্লাইওভারের টোল বাদ দেয়া হয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত এ টোলহার ‘বাস্তবসম্মত হবে না’ বলে মত দিয়েছে খোদ সওজ অধিদপ্তরের টোলহার নির্ধারণী কমিটি। গত বছরের ১৬ মার্চ টোলহার নির্ধারণের লক্ষ্যে মহাসড়কটি পরিদর্শন করে এ কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনের পরামর্শ ও মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘টোল নীতিমালা ২০১৪ অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ভিত্তি টোল ২ টাকা হিসেবে ৫৫ কিলোমিটার সড়কের টোলহার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে পোস্তগোলা সেতু (বুড়িগঙ্গা সেতু), ধলেশ্বরী সেতু ১ ও ২ এবং আড়িয়াল খাঁ সেতুর টোল। এ হিসাবে টোলহার অস্বাভাবিক বেশি বলে প্রতীয়মান হয় এবং স্থানীয় যানবাহনের (স্বল্প দূরত্বের) ক্ষেত্রে এ হারে টোল আদায় বাস্তবসম্মত হবে না।’

ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্রস্তাব গতকাল সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক সভায় উপস্থাপন করেছে সওজ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত টোলহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত (পদ্মা সেতুর টোল বাদে) একটি ট্রেইলারে টোল হবে ২ হাজার ২৭৫ টাকা। ভারী ট্রাকের টোল হবে ২ হাজার ২২০ টাকা। মাঝারি ট্রাকের টোল বা ভিত্তি টোল হবে ১ হাজার ১১০ টাকা। একইভাবে বড় বাসের জন্য ৯৯৯ টাকা, ছোট ট্রাক ৮৩৩, মিনিবাস ৫৫৫, মাইক্রোবাস ৪৪৪, পিকআপ/জিপ ৪৪৪, সেডান কার ২৭৮ ও মোটরসাইকেলের জন্য ৫৬ টাকা টোল আদায়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর টোল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ২০১৮ সালে পদ্মা সেতুর জন্য ১৫ বছরের একটি টোলের তালিকা প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। সওজ অধিদপ্তর ও সেতু কর্তৃপক্ষের টোল প্রস্তাব চূড়ান্ত হলে পদ্মা সেতুসহ পুরো এক্সপ্রেসওয়েটি ব্যবহারের জন্য একটি ট্রেইলারের খরচ হবে ৬ হাজার ৭৭৫ টাকা। একইভাবে ভারী ট্রাকে ৪ হাজার ৯৯৫ টাকা, মাঝারি ট্রাকে ৩ হাজার ২১০, বড় বাসে ৩ হাজার ৩৭০, ছোট ট্রাকে ২ হাজার ৪৫৩, মিনিবাসে ২ হাজার ৫৮০, মাইক্রোবাসে ১ হাজার ৭৩৪, পিকআপ/জিপে ১ হাজার ১৯৪, সেডান কারে ১ হাজার ২৮ ও মোটরসাইকেলে ১৬১ টাকা টোল আদায় হতে পারে।

সওজ অধিদপ্তরের প্রস্তাবে এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ি প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য চারটি পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা-মাওয়ার মধ্যে আব্দুল্লাপুর ও শ্রীনগরে গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে পারবে। একইভাবে পাচ্চর-ভাঙ্গার মধ্যে মালিগ্রাম ও পুলিয়াবাজারে গাড়ি প্রবেশ ও বের হতে পারবে।

সওজ অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত টোলহার চূড়ান্ত করতে গতকাল ১৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবু ছাইদ শেখকে। সদস্য সচিব করা হয়েছে উপসচিব (টোল ও এক্সেল) ফাহমিদা হক খানকে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে টোলহার চূড়ান্ত করার জন্য সুপারিশ করবে এ কমিটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব ফাহমিদা হক খান বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের যে টোলহার সওজ অধিদপ্তর প্রস্তাব করেছে, সেটা এখনো চূড়ান্ত কিছু নয়। আমরা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখব। টোলহার কেমন হওয়া উচিত, প্রস্তাবে কী আছে—সবকিছু মিলিয়েই আমরা প্রতিবেদন দেব।

এক্সপ্রেসওয়েতে কবে নাগাদ টোল কার্যকর হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে তিনটি সেতুর টোল আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরে এক্সপ্রেসওয়ের কোনো টোল নেয়া হচ্ছে না। পদ্মা সেতু চালুর পর এটা শুরু হবে। তখন পদ্মা সেতু বাদে সব সেতুকে যুক্ত করে এক্সপ্রেসওয়ের টোল আদায় করা হতে পারে বলে জানান তিনি।

গতকাল অনুষ্ঠিত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের টোলহার নির্ধারণী সভায় অংশীজন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সওজ অধিদপ্তর প্রস্তাবিত টোলহারটি বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, যে টোলহার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়। আমরা সভাতেই বিষয়টি তুলে ধরেছি। এছাড়া নতুন করে যে কমিটি করা হয়েছে, সেখানে আমাদেরও রাখা হয়েছে। এ কমিটির কার্যক্রমেই আমরা প্রস্তাবিত টোলহারটি নিয়ে আপত্তি তুলব। সুত্রঃ বনিকবার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *