ইসলামে শিশুর অধিকার

ইসলামে শিশুর অধিকার – মুহাম্মাদ মাজহারুলইসলাম   

“A today’s children are tomorrow’s Steersmen” তথা আজকের শিশু আগামী দিনের কর্ণধার, তারাই আগামী দিনে সুস্থ-সুন্দর আদর্শিক ও কল্যাণকর সমাজ নির্মাণে অবদান রাখবে।

শিশুদের মাঝে লুকিয়ে আছে অফুরন্ত সম্ভাবনা অনেক আশার আলো। শিশুদের সুন্দর ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়তে না পারলে সে আশা কোন অবস্থাতেই পূর্ণ হবেনা। শিশু-কিশোরদের যথার্থ পরিচর্যা বাদ দিয়ে একটি উন্নত ও আদর্শ জাতি গঠনের চেষ্টা অনেকটা অরণ্যে রোদনের মত। একটি সমাজের বড় ব্যর্থতা হচ্ছে তার শিশু কিশোরদের সুন্দর সুস্থ ও আদর্শিক রূপে গড়ে না তোলা। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশিত পন্থায় আমরা যদি আমাদের শিশু-কিশোরদের অধিকার আদায় করি, তাদের যথার্থভাবে গড়ে তুলি, তাহলে তারাই একদিন সমাজ ও দেশের হাল ধরবে শক্ত হাতে, জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উন্নতির স্বর্ণশিখরে বা সোনালি দিগন্তে। তাই ইসলাম প্রদত্ত শিশুদের-কিশোরদের নিম্নের অধিকার যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

১. জীবনের নিরাপত্তাঃ ইতিহাস সাক্ষী আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত জীবন-ব্যবস্থা তথা ইসলাম আসার আগে শিশুদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা ছিল না, বরং মেয়েশিশুদের জীবন্ত কবর দেয়া হত। ইসলামই সর্বপ্রথম শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছে। কুরয়ানের ভাষায়, দারিদ্র‍্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমি তোমাদের ও তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকি।(বনী ইসরাঈলঃ ৩২)

২. কানে আজান দেয়াঃ সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে হোক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর পরিষ্কার করে ডান কানে আজান আর বাম কানে ইকামত দেয়া পিতামাতার অন্যতম কর্তব্য। শয়তানের ক্ষতি থেকে সন্তানকে হেফাজতের এটি অন্যতম মাধ্যম। আবু রাফে (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল (সাঃ) কে হাসান ইবনে আলীর কানে আজান দিতে দেখেছি।(সুনানে আবু দাউদ)

৩. সুন্দর নাম রাখাঃ একজন সন্তানের অন্যতম অধিকার হচ্ছে একটি সুন্দর ও অর্থবহ নাম। আবু দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, কেয়ামতের দিন তোমাদের নাম এবং তোমাদের বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো। (মুসনাদ আহমাদ) ৪. আকিকা করাঃ আকিকা ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয়। এটি সন্তানের অন্যতম অধিকার। ছেলের পক্ষ থেকে দুটি ছাগল আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আল্লাহর নামে জবেহ করা। হজরত আবু সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন সব নবজাতক শিশু আকিকার সাথে আবদ্ধ। (সুনানে আবু দাউদ)

৫. দুধ পান করানোঃ এটি শিশুসন্তানের অন্যতম অধিকার। কারণ মায়ের বুকের দুধ একজন শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে অন্যতম ভূমিকা পালন করে। কোরআন মাজীদের বর্ণনায়, প্রত্যেক জননী তাদের সন্তানকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে। (সুরা বাকারাঃ ২৩৪) তাই যে সব মা নিজেদের স্বাস্থ ও সুন্দর্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে শিশু সন্তানকে দুধ পান থেকে বঞ্চিত করেন, তাদের অবশ্যই পরকালে জবাবদিহি করতে হবে।

৬. সদকা করাঃ ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রূপা সদকা করা সুন্নত। হজরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত, হাসান (রাঃ) এর পক্ষ থেকে একটি বকরি সদকা করেছেন তিনি বলেন, রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ থেকে একটি বকরি সদকা করেছন এবং হযরত ফাতেমা (রাঃ) কে বলেছেন, তার মাথা মুণ্ডুুন করো এবং চুল পরিমাণ রূপা সদকা করো। (বুখারী ও মুসলিম)

৭. খাতনা করাঃ ছেলে শিশুদের খাতনা করা অন্যতম সুন্নত। এটি শিশুর অধিকাও। হজরত জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন (রাঃ) এর খাতনা ও আকীকা সপ্তম দিবসে করেছেন। (সুনানে তিরমিজি)

৮. তাওহীদ শিক্ষা দেয়াঃ শিশু কথা বলা আরম্ভ করার সাথে সাথেই তাকে তাহিদ শিক্ষা দিতে হবে। হযরত মায়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) কে ইয়ামেনে পাঠানো প্রক্কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম বলেছেন, তুমি তাদেরকে সর্বপ্রথম তাওহীদের শিক্ষা দেবে।

৯. সয্য পৃথকঃ সন্তানের বয়স যখন সাত কিংবা তার অধিক হয়, তখন তার জন্য পৃথক শয্যাব্যবস্থা করা বাবা – মার অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব৷ কেননা, রাসূল সা: বলেছেন, ‘তােমরা তেমাদের সন্তানদেরকে সাত বছর বয়সে শয্যা পৃথক করে দাও ৷’ (মুসনাদে আহমাদ)

১০. দীনে জ্ঞান শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানদের দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেয়া বাবা-মার ওপর কর্তব্য। কেননা, সন্তানকে দ্বীনি জ্ঞান তথা ঐহির জ্ঞান না দিলে সে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হজরত আনাস বিন মালিক রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্ৰত্যেক নর-নারীর ওপর (দ্বীনি) জ্ঞানার্জন করা ফরজ। (সুনানে ইবনে মাজাহ)

১১. আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়াঃ সন্তানদের আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া বাবা-মার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। কুরআনে হজরত লুকমান আ: তার মৃত্যুর প্রাক্কালে ছেলেকে বলেছেন, আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখকে ফিরিয়ে নিও না, জমিনে গর্ব, অহঙ্কার করে চলাফেরা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। চলার ক্ষেত্রে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করো, তোমার আওয়াজকে নিচু করো ’ (সূরা লুকমান : ১৮, ১৯)

১২. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করাঃ সন্তানদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করা বাবা-মার অন্যতম দায়িতৃ ও কর্তব্য। নবী করিম সা: বলেছেন, ‘তােমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাদের মাঝে ইসনাফ কায়েম করো ৷’ (বৃখারি ও মুসলিম)

১৩. দোয়া করাঃ সন্তানদের কল্যাণার্থে দোয়া করা বাবা-মার ওপর অতীব জরুরি। কেননা, আল্লাহ তাদের জন্য দোয়া করতে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। ‘আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের বব! আমাদের এমন সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি অমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।’ (সূরা ফুরকান : ৭ ৪ )

পরিশেষে বলা যায়: ইসলাম প্রদত্ত উপরোক্ত অধিকারগুলাে যদি আমরা সন্তানদের যথাযথভাবে দিয়ে থাকি, তবে তারা একজন নেক ও আদর্শিক সন্তান হিসেবে গড়ে উঠবে। আর এদের দ্বারাই একটি সুস্থ, সুন্দর, আদর্শিক ও কৃল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *