আমেরিকায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আগামী চার বছরের প্রধান চ্যালেঞ্জ: তানিজা খানম জেরিন

আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদয় পানি ঘোলা করে অবশেষে আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে গতকাল বিশই জানুয়ারী ৫৯তম অভিষেকের মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আমেরিকার দুইশো বত্রিশ বছরের ইতিহাসে এতো কড়া নজিরবিহীন নিরাপত্তার বলয়ে কোন প্রেসিডেন্টেরই অভিষেক অনুষ্ঠান হয়নি। নাশকতা ও উগ্রপন্থীদের সশস্ত্র হামলার আশঙ্কায় আমেরিকার পঞ্চাশটি রাজ্যেও সতর্কতা মূলক বাড়তি নিরপত্তা ব্যবস্হা নেয়া হয়েছিল। দু:খজনক হলো আমেরিকার ইতিহাসে গণতান্ত্রিক বিশ্বের নিয়ম অনুযায়ী অভিষেক অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উপস্হিত ছিলেন না। আমেরিকার প্রথা ও নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণের মাধ্যমে একশো দিনের বিশেষ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্টের ঘোষিত কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে প্রধান তিনটি লক্ষ্য মাস্কিং, ভ্যাকসিন, ও স্কুল খোলা। নতুন দায়িত্ব প্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের প্রথম চ্যালেঞ্জিং কাজ হলো একশো দিনের মধ্যে দশকোটি মানুষকে করোনার ভ্যাকসিন প্রদান করা। উল্লেখ্য এই একশো দিনই সমগ্র আমেরিকানবাসীকে বাধ্যতা মূলকভাবে সর্বত্রই মাস্ক পড়ে চলাচল করতে হবে। নতুন দায়িত্ব গ্রহণকারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাতটি মুসলিম দেশের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ সংশোধিত দ্বিতীয় স্টিমুলাস বিল, অর্থনৈতিক অবস্হা পুনরুদ্ধার, অভিবাসনের নতুন পরিকল্পনায় রোডম্যাপ টু ফ্রিডম এর আওতায় এক কোটি দশ লাখ লোকের বৈধতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, পূর্ব ঘোষনা অনুযায়ী জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলনের প্যারিস চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার কর্মসূচী, এ ছাড়াও করোনাকালে ছাত্র-ছাত্রী বিতারণ রোধ, আটক অবৈধ শিশু – কিশোরদের কে পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দেয়া সহ স্টুডেন্ট লোনের স্হগিতাদেশের বিরুদ্ধে সহ সতেরটি নির্বাহী আদেশে সই করলেন।

দুই হাজার বিশের প্রেসিডেনসিয়াল নির্বাচনের নানা অঘটন ও অনেক বিতর্কিত ঘটনা নির্বাচন পরবর্তী বর্তমান প্রেসিডেন্ট কর্তৃক ফলাফল না মেনে মামলা মোকাদ্দমা ও যে অশুভ কার্যক্রম ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল সর্বশেষ ৫ই জানুয়ারী ট্রাম্প কর্তৃক তার উগ্র সমর্থকদের নিয়ে যে ব্যর্থ অভ্যূত্থানের চেষ্টা চলছিল এতে করে গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে আমেরিকার ২৪৫ বছরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক ধারার যে সুনাম বিশ্বে ও আমেরিকায় ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা পুনরুদ্ধারের জন্য জো বাইডেন – কমলাকে আগামী ১৪৬০ দিনকেই কাজে লাগাতে হবে। আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২২ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী দু’বছর কংগ্রেসের নিম্ন ও উচ্চ কক্ষে ডেমোক্রেটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় যে কোন বিল, প্রকল্প, আইন নিশ্চিত ভাবেই বাইডেন – কমলা বিনা -বাধায় নীতি নির্ধারণ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। যদি না মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটদের হাউজ ও সিনেটে ভরাডুবি না হয় তাহলে আগামী চার বছর বাইডেন – কমলা জুটি বর্তমান করোনা সঙ্কটসহ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অভিবাসন নীতিসহ ট্রাম্প – পেন্স গত চার বছর যে অব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের যে পাহাড়-সম জঞ্জাল রেখে যাচ্ছেন আশা করি আগামী ১৪৬০ দিনের সুশাসনের মাধ্যমে পূর্বাবস্হায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। বাইডেন – কমলার প্রতিদিনের সবচেয়ে যে কঠিন কাজটি হবে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট কর্তৃক গণতন্ত্র ধ্বংস গণতান্ত্রিক রীতি নীতির প্রতি অশ্রদ্ধা আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে ক্ষুণ্ণ করেছেন তা পুনরুদ্ধার করা।

বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমেরিকায় ও সারাবিশ্বের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। গত ১৪৬০ দিনে আমেরিকার ইতিহাসে এমন কোন নিন্দনীয় কাজ নেই যে করে নাই সে প্রতিদিনই মিথ্যা কথা বলেছে এবং তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করলেই তাকে সাথে সাথে ফায়ার! আমেরিকার ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনা খুব কমই ঘটেছে যে প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেউ দুইবার ইমপিচমেন্ট হয়েছেন। আশা করি আগামী সিনেট অধিবশনে ক্ষমতার দাপট এবং ৬ই জানুয়ারী গণতন্ত্র ধ্বংস করার জন্য সিনেট কর্তৃক তাকে অবশ্যই চূড়ান্ত ভাবে অভিসংশিত করা হবে যাতে পরবর্তী ২০২৪ সনের নির্বাচনে না দাঁড়াতে পারে। উল্লেখ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বর্ণবাদের চরম প্রবক্তা হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবেন। জনগণকে বিভাজন করা বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করা এবং বিদায় মুহূর্তেও ডোনেশনের বিনিময়ে শত শত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা ভোটাধিকারের এবং ভোটের ফলাফলের প্রতি বিশ্বাস না করে উল্টো চার ডজন মামলা দাখিল করা প্রচলিত নিয়ম নীতি অমান্য করে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে স্বীকার না করা, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কে অভিনন্দন না জানানো ছিল তার চরম উদ্ধাত্যপূর্ণ আচরণ। বিদায়ী প্রেসিডেন্টের উস্কানিতে তার উগ্রপন্থী অন্ধ সমর্থকরা ৬ই জানুয়ারী ওয়াশিংটনের ক্যাপিটাল হিলে তাণ্ডব চালিয়েছিল এবং তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইককেল পেন্স ও হাউজ স্পীকার ন্যান্সি পেলোসিকে হত্যার ষড়যন্ত্র পর্যন্ত করেছিল। একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হয়েও সে ব্যর্থ অভ্যূত্থানে পাঁচজনের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে তার হাত। আজ থেকেই শুরু হবে তার বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ৬ই জানুয়ারীর তাণ্ডবে উস্কানি দাতা হিসেবে মামলা রুজু হবে। উল্লেখ্য পেন্টাগন কর্তৃক তার বিদায় অনুষ্ঠানটিও বাতিল করা হয়েছে। আমেরিকার গণতান্ত্রিক বাক-স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক ও টুইটার স্হায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে হায়রে লজ্জা!!

গণতান্ত্রিক মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পুনর্গঠনে বাইডেন – কমলাকে অনেক কঠিন পরিশ্রম করতে হবে; ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট বাইডেন একদল চৌকস, সৃজনশীল, কর্মঠ, উদ্যমী, অভিজ্ঞ সফল কর্ম কর্তাদের কে তার কেবিনেটে নিয়োগ দিয়েছেন। আশা করি চীন রাশিয়াসহ মুসলিম দেশ গুলির সাথে তার পররাষ্ট্র নীতি আরো সুদৃঢ় সম্পর্ক হবে; ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারেও তার সহনশীল পররাষ্ট্র নীতির স্বাক্ষর দেখতে পাবো। মনে রাখতে হবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতায় আপাদমস্তক একজন ঝানু রাজনীতিবিদ; অনেক রিপাবলিকান গভর্ণর, সিনেটর, মেয়র এবং কংগ্রেসম্যানের সাথে তার দীর্ঘকালের সুসম্পর্ক রয়েছে। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক কাজেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। পাশাপাশি নব নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও তার জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রথম হওয়াসহ এ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আমেরিকানবাসী অনেক আশাবাদী দেশের শান্তি ফিরিয়ে আনতে, বর্তমান করোনা সঙ্কট দ্রুত দুরীভূত করে অর্থনৈতিক সঙ্কট পুনরুদ্ধার করে দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আশা করি গণতন্ত্রের যে সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে দলমত নির্বিশেষে সকল জনগণকে সাথে নিয়ে নতুন প্রেসিডেন্ট তা পুনরুদ্ধার করবে। ভেদাভেদ হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে মানবিক ও কল্যাণকর আমেরিকা পুনর্গঠনে বাইডেন- কমলা ও তাদের কেবিনেট কাজ করে যাবে। আরো আলোকিত হোক আমেরিকার গণতান্ত্রিক রীতি- দূর হোক বর্ণ -বৈষম্য, ফিরে আসুক পূর্ণন্যায্যতা ও সম-অধিকার, সুব্যবস্থা হোক কর্ম-সংস্হানের, অর্থনীতির চাকা সচল হোক পুরোদমে। করোনা সঙ্কটের পর বেঁচে যাওয়া সকল আমেরিকানবাসী সহ নতুন প্রজন্মের জন্য গড়ে উঠুক শান্তিময় আমেরিকা। সকল মার্কিন জনগণের প্রেসিডেন্ট ও ভাইস- প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন – কমলা হ্যারিসের আগামীর পথ চলা শুভ হোক- শান্তি-ময় হোক, কল্যাণকর হোক।

লেখক: তানিজা খানম জেরিন, কলামিস্ট নিউইয়র্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *